• শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ০৫:১৪ অপরাহ্ন

আমরা দয়া দেখিয়ে থাকতে দিয়ে কি অন্যায় করেছি ?

আপডেটঃ : মঙ্গলবার, ২৩ মার্চ, ২০২১

গাজী মমিন, ফরিদগঞ্জ:
হামলার একমাস গত হওয়ার পরেও আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। একদিকে পুলিশের ভয়, অন্যদিকে ফের সন্ত্রাসী হামলার আতঙ্ক, সব মিলিয়ে সর্বশান্ত হয়ে আতঙ্কে জীবন যাপন করছে উপজেলার ১১ নং চরদুখিয়া পূর্ব ইউনিয়নের পশ্চিম সন্তোষপুর গ্রামের খলিফা বাড়ির মানুষেরা।
এ ঘটনায় আহত সদস্যরা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসারতবস্থায় জীবন-মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। পুড়িয়ে দেয়া বসতঘরের সামনে মানববন্ধন করে প্রশাসনের কাছে বিচার প্রার্থনা করে চিৎকার করে কাঁদতে দেখা যায় ওই বাড়ির বাসিন্দাদের।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, গত ২২ ফেব্রুয়ারি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওইবাড়িতে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে একটি বসতঘর পুড়িয়ে দেয়, এসময় আরও ১২টি বসতঘর ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়। দুটি গোয়ালঘর থেকে ৬টি গরু লুটকরে নিয়ে যায়। এ সময় সন্ত্রাসীদের বাধা দিতে গিয়ে এক ব্যাংক কর্মকর্তার পরিবারের তিন সদস্যসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়।
ঘটনার পরের দিন, উপজেলার ১০ নং ইউনিয়নের এমরান হোসেন ভূঁইয়া (৪৫), তকির আহম্মেদ ভূঁইয়া (২৪) একই উপজেলার বিশকাটালী গ্রামের লিটন (৪০), পশ্চিম লাড়ুয়া গ্রামের নয়ন হোসেন কসাই(২৭), পশ্চিম সন্তোষপুর গ্রামের শানু বেগম (৩৫), লাকি বেগম (২২), লাভনী আক্তার (২০) সহ অজ্ঞাত আরো ৬০/৭০ জনকে অভিযুক্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি ফরিদগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নং ২৪। থানা পুলিশ মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযুক্ত ২জনকে আটক করাসহ ৩ টি গরু উদ্ধার করেছে। এছাড়া ওই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত আর কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
ঘটনার প্রায় একমাস গত হওয়ারপর ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জনশূন্য বাড়িটিতে এখনো পড়ে আছে পুড়িয়ে দেয়া বসতঘরে থাকা বিভিন্ন আসবাবপত্রের চিহ্ন, পড়ে আছে পুড়িয়ে দেয়া গবাদি পশুর খাদ্য খড়েরগাঁদা, রয়েছে ওই বাড়ির অভিমুখ হতে কেটে দেয়া ফলজ গাছের চারা গুলোসহ ভাংচুরকৃত বাড়ির প্রতিটি বসতঘরের চিত্র তান্ডবের নমুনা জানান দেয়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঘরের মধ্যে থাকা চাল আগুনে পুড়ে চালভাজা হয়ে রয়েছে। ঘরের পাশের রান্না ঘরে চুলার উপর পানির পাত্রে এখনো পানি রয়েছে। দ্ইু পাশের গাছগুলো আগুনের ভয়াবহতার প্রমাণ দিচ্ছে। বাড়ির পাশেই গরুর ঘরে থাকা গরুগুলো লুটে নেওয়ার আগে খড়ের গাঁদাটিও পুড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।
কথা হয় সন্ত্রাসী হামলায় আহত নুর মোহাম্মদের স্ত্রী জাহিদা বেগমের সাথে, তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার সুখের সংসার আজ তচনছ। সামান্য একটি জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে এভাবে আমাদের সবকিছু জ¦ালিয়ে দিয়ে পথে বসিয়ে দিবে সন্ত্রাসীরা তা মেনে নিতে পারছি না। আমার স্বামী ও ছেলেরা আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছে। আর আমরা প্রতিপক্ষ এমরান বাহিনীর হুমকির মুখে রয়েছি। তারা আমাদের বাড়িঘর সবকিছু জ¦ালিয়ে দেয়ার পরও এখনো আমাদের পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিবে বলে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, দোষ আমাদেরই কারণ আমরা কেন মানবতা দেখিয়ে ক্রয়কৃত সম্পত্তির উপর লোকমানদের থাকতে দিয়েছিলাম। ফলে ওই লোকমানের স্ত্রীর ইন্দনে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা আমাদের সর্বশান্ত করেছে। আতংকের কারণে আমরা দুরে গিয়ে স্বজনদের বাড়িতে রাত যাপন করি।
নুর মোহাম্মদের ভাই মোক্তার আহাম্মদ ও তোফায়েল আহাম্মদ জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেখেছি। আজ ৫০ বছর পর আমাদের সেই কথা মনে করিয়ে দিল সন্ত্রাসীরা। পাকহানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা ‘আইয়ে আইয়ে’ শব্দ শুনে আমরা পালিয়ে যেতাম। তেমনি এখনো আমরা ‘আইয়ে আইয়ে” শুনে আতংকে থাকি। ভয়ে রাতে বাড়িতে থাকি না। যদি আবার হামলা করে আমার ভাইয়ের বাড়ির মতো আমাদের বাড়ি ঘর পুড়ে ফেলে এবং আমাদের শেষ করে দেয় , এই ভয়ে।
নুর মোহাম্মদের মেয়ে জেসমিন চিৎকার করে কেঁদে বলেন, আমরা স্বাধীন দেশে থেকেও পরাধীনের মতো রয়েছি। এমরান বাহিনীর লোকজন সর্বক্ষণ আমাদের ফলো করে। আমার পরিবারের সর্বশান্ত করে ফেলেছে। তারা এখনো বীরদর্পে ঘুরছে, কিন্তু পুলিশ কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।
হামলায় আহত ঢাকায় চিকিৎসাধীন গিয়াস উদ্দিন জানান, বর্তমানে ওমান প্রবাসী লোকমান তার কাছে ঘর ভিটা বিক্রি করে। তাদের বসবাসের কোন ব্যবস্থা না থাকায় আমি ২ বছরের জন্য থাকতে দেই। সেই সময়ে বিদেশ যাওয়ার সময়ে আমি ৩৫ হাজার টাকা ঋণ দেই। যা সে আস্তে আস্তে পরিশোধ করে। ২ বছর পর সে আবারো ঘরে ২ বছর থাকার জন্য আবেদন করে। সেই সময়েও আমি তাদের থাকতে দেই। আমি ১০ হাজার, আমার বাড়ির শাহাজাহান মাস্টার ১০ হাজার এবং আমার চাচারা মিলে মোট ১লক্ষ টাকা দিয়ে তাকে ওমান যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেই। কিন্তু লোকমান বিদেশে চলে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় হুমকি ধমকি। লোকমানের স্ত্রী শাহনুর বেগম পাশ^বর্তী ইউনিয়নের এমরান হোসেনসহ লোকজনের সাথে সখ্যতা করে এসব কাণ্ড শুরু করে। সর্বশেষ গত ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে আমি লোকজন নিয়ে পুকুর পাড় বাঁধাই কালে হঠাৎ করেই এমরান এসে আমাদের সাথে তর্কে জাড়িয়ে পড়ে। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে দেখাচ্ছি বলে বেড়িয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার বাড়ির চারিদিক থেকে শতাধিক লোকজন অস্ত্র স্বস্ত্র নিয়ে আসে হামলা শুরু করে। আমাদের মারধর করে এবং আমার বাড়িটি জ¦ালিয়ে দেয়। এছাড়া আমার বাড়ির চাচাসহ অন্যদের বসতঘরেও হামলা করে ও ভাংচুর করে। সস্ত্রাসীরা আমাদের গোয়ালঘরের সবগুলো গরুসহ মোট ৬টি গরু নিয়ে যায়।
আমরা আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছি। কিন্তু আমার মা ছোট ভাই পরিবারের অন্যসদস্যরা প্রতিদিন আতংকে দিন কাটাচ্ছে।
এবিষয়ে ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ শহীদ হোসেন জানান, ওই ঘটনা শুনারপর সাথে সাথে পুলিশ পাঠিয়েছি, পরেরদিনই থানায় মামলা হয়েছে। ৩টি গরু উদ্ধার করা সহ দু’জনকে আটক করে আদালতে প্রেরণ করেছি, এছাড়া অন্য অভিযুক্তদেরও আটকের চেষ্টা চলছে।
এদিকে প্রবাসী লোকমান হোসেনের স্ত্রী শাহনুর বেগম (শানু) জানান, তাদের বাড়িতেও হামলা করেছে প্রতিপক্ষরা। তিনিও আতংকে রয়েছেন।
ঘটনাটি শুনারপর জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও চাঁদপুর-০৪ ফরিদগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য সাংবাদিক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান ঘটনার স্থান পরিদর্শন করে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আনার জন্য থানা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।


এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ

ফেসবুকে মানব খবর…