রাফিউ হাসান :

 

কে এই কিরন! যার বিরুদ্ধে শত অভিযোগ থাকার পরও তিনি এলাকায় হাঁকডাক দিয়েই চলছেন। তার হুমকি-ধমকির কারণে অনেকেই মুখ খুলতে চায় না। ঘটনাটি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সূচীপাড়া উত্তর ইউনিয়নের শোরসাক গ্রামের।

 

জানা যায়, ওই গ্রামের মজুদার বাড়ির নিজাম উদ্দিন কিরনের বিরুদ্ধে সরকারের দেয়া বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার কার্ড, প্রধানমন্ত্রী আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর দেয়ার নাম করে বিভিন্ন জনের কাছে থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়াসহ সরকারী কাজে নানা অনিয়ম দুর্নীতি করে অর্থ আত্মসাত করার অভিযোগ করছে এলাকাবাসী।

 

সরেজমিনে জানা যায়, শাহরাস্তি উপজেলার সূচীপাড়া উত্তর ইউনিয়নের শোরসাক গ্রামের বাসিন্দা হলেন কিরণ। তার ভাই শাহীন মজুমদার হলেন শাহরাস্তি উপজেলার সূচীপাড়া উত্তর ইউনিয়ন যুবলীগের আহবায়ক। নিজাম উদ্দিন কিরণ আওয়ামীলীগ ঘরোনার লোক। তিনি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের আপন মামাতো ভাই। ইউপি চেয়ারম্যানের আপন লোক হওয়ায় গ্রামে প্রভাব বিস্তার করে চলেন তিনি৷ বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও মামাতো ভাইয়ের সখ্যতার পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রতারণা করে আসছেন স্থানীয়দের সাথে। এমনকি নিজেকে স্থানীয় এমপির ভাগ্নে পরিচয় দিয়েও প্রতারণা করছে বলে জানা যায়।

 

ভুক্তভোগীর অভিযোগ (১)
শোরশাক গ্রামের আক্তার হোসেন(২৬), পিতাঃ মৃত বশির উদ্দিন পেশায় একজন বেকারী শ্রমিক। দিন আনে দিন খায় গোছের লোক এরা। খুব কষ্টে দিনাতিপাত করা লোকটির পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৪ জন। জরাজীর্ণ ঘরে গাদাগাদি করে থাকেন তারা একই ছাদের নিচে। ভুক্তভোগী আক্তার প্রধানমন্ত্রী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের কথা শুনে এক চিলতে আশা দেখতে পান। তাই নিজের জন্য একটি ঘরের আবেদনের জন্য হন্যে হন্যে ঘুরেছে পুরো এলাকায়। ঠিক তখনি তিনি পরিচয় হোন কিরণ নামের অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে। কিরণ ঘর দেওয়া বাবদ আক্তারের কাছে দাবি করেন মোটা অংকের অর্থ। যার জন্য এলাকার মিজানের মাধ্যমে ৬০০০ টাকাও প্রদান করেন গত ৬ মাস পূর্বে। কিরন টাকা নেওয়ার পরেও ঘর দিচ্ছি, দিবে বলে আক্তারকে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরাচ্ছে। এতে করে আক্তার আশাহত হয়ে আজ করোনার মহামারীতে দিশেহারা হয়ে ঘুরছে। একদিকে কাজ নেই, অপরদিকে সামান্য বৃষ্টিতে ঘর দিয়ে পানি পড়ে, এমন অবস্থায় নিজের মানুষিকতা ঠিক রাখতে পারছে না। তার স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে নিজের ভাঙ্গা বাড়িতে। টাকা নেওয়ার ব্যাপারে স্বাক্ষী রিপন মিয়া বলেন, আক্তার গত ৬ মাস পূর্বে সরকারী ঘর পাওয়ার জন্য পান দোকানদার মিজানের মাধ্যমে কিরণকে নগদ ৬০০০ টাকা প্রদান করেন। আমি বিষয়টি দেখেছি। কিন্তু টাকা নেওয়ার এতোদিন পরেও ঘর না পাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ (২)
হাড়াইর পাড়ার গাইন বাড়ির বাসিন্দা দুলাল (৩০), পিতাঃ ইসমাইল, গৃহস্থালি কাজ করে খুব কষ্ট করে সংসার চালায়।
সরকারীভাবে ঘরের আশায় তিনিও ৩০০০ টাকা প্রদান করেন অভিযুক্ত কিরনকে। অসহায় পরিবারকে নিয়ে নিদারুন কষ্টে জীবন যাপন করা দুলাল ৮ মাস পূর্বে টাকা প্রদান করেও আজও ঘর পায় নি। অনেকটা আক্ষেপ করেই দুলাল বলেন, সরকারী বিনামূল্যের ঘর টাকার বিনিময়ে চাওয়াটা আমার নিজের অন্যায়। তবুও একটু সুখের আশায় টাকার বিনিময়ে ঘরের আশায় আজ আমি প্রতারিত। আমি এর বিচার চাই বলে তিনি কেঁদে দেন।

 

ভুক্তভোগীর অভিযোগ (৩)
হাড়াইর পাড়ার দুলালের পিতা ইসমাইল মিয়া(৭৩) বৃদ্ধ ভাতা পাওয়ার আশায় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে আশার প্রদীপ হয়ে আসা কিরনকে ৬/৭ মাস পূর্বে পরিচিত হোন। কিরন তার নিকট বৃদ্ধ ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ১০০০ টাকা দাবি করেন। কিন্তু বৃদ্ধ ইসমাঈল মিয়া নিজের ঔষধের জন্য রাখা ৫০০ টাকা কিরনের হাতে তুলে দেন বিশ্বাসের জায়গা থেকে। অথচ আজও পর্যন্ত তিনিও পান নি কোন বৃদ্ধ ভাতা। তিনিও আক্ষেপের সুরে বলেন, আর কত বয়স হলে আমি পাবো বৃদ্ধ ভাতা। শরীরে বিভিন্ন রোগের বাস। আর কতটা অসহায় হলে জনপ্রতিনিধিরা আমার দিকে সদয় দৃষ্টি দিবেন।

 

ভুক্তভোগীর অভিযোগ (৪)
হাড়াইর পাড়া গ্রামের আরেক বাসিন্দা হাফেজ নূরে আলম(২৩), পিতা- ইসমাইল এর নিকট হতে প্রধানমন্ত্রী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়ার নাম করে অভিযুক্ত কিরণ নিয়েছেন ৩০০০ টাকা। হাফেজ নূরে আলম নিজের কষ্টার্জিত টাকায় কিনা সাইকেল বিক্রি করে ৭ মাস পূ্র্েব সুখের আশায় তুলে দেন কিরনের হাতে নগদ অর্থ। অথচ এতো দিন পার হলেও ঘরতো দূরে থাকুক, কোনো আশার বাণীও শুনতে পায় নি কিরণের নিকট হতে।

ভুক্তভোগী ২, ৩ ও ৪ সম্পর্কে ছেলে, বাবা ও ভাই। একই পরিবারের তিনজনের নিকট হতে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া টাকার ব্যাপারে এলাকাবাসী বলেন, অসহায় ও গরীব পরিবারগুলোর বিশ্বাস নিয়ে খেলছে কিরণ। নিজে সরকারী অনুদানের কিংবা কাজের কথা বলে প্রতিনিয়ত ঠকাচ্ছে এলাকার নিরীহ মানুষগুলোকে।

অভিযোগের ব্যাপারে অভিযুক্ত কিরন মজুমদার বলেন, আমি যা করেছি সর্বসাধারণের জন্যই করেছি। যারা অতীতে লুটেপুটে খেয়েছে তারা আজ আমার কারণে করতে পারছে না বলেই আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে। এতে আমি বিচলিত নই। আপনাদের কিছু জানতে হলো তা চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে যোগাযোগ করে জেনে নেয়ার কথা বলেন তিনি।

ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ মোস্তফা কামাল মজুদার বলেন, কিরন মজুমদার আমার প্রতিবেশী। সে ইউনিয়ন পরিষদের কেউ নয়। সে যদি সরকারী দান অনুদান বিতরণে কোনো প্রকার অনিয়ম করে এবং এলাকাবাসীদের কারও কাছ থেকে কোনো প্রকার টাকা পয়সা নিয়ে থাকে তাহলে সে তার নিজ দায়িত্বে তা বহন করবে।

Share This post