• মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ০৯:৩৯ অপরাহ্ন

ফরিদগঞ্জে বিলুপ্তির পথে বাঙালীর ঐতিহ্য মৃৎ শিল্প

আপডেটঃ : শুক্রবার, ৫ নভেম্বর, ২০২১

গাজী মমিন,ফরিদগঞ্জ:
এক সময় গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে রান্নাবান্না, খাওয়া-থাওয়া আর অতিথি আপ্যায়ন, প্রায় সব কাজেই মাটির তৈরি হাড়ি পাতিলের ব্যবহার ছিলো। স্বাস্থ্যকর আর সহজ লভ্য ছিলো বলে সব পরিবারেই ছিলো মাটির পাত্রের ব্যবহার। আর এই শিল্পে সমৃদ্ধ ছিলো ফরিদগঞ্জ উপজেলা। বর্তমাতে অর্থ ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিলুপ্তির পথে প্রায় হাজারো বছরের ঐতিহ্য মৃৎ শিল্প।
শীতে খেজুর রস সংগ্রহের জন্য হাড়ি, বাহারি চিতই, পুলি ও বাঁপা পিঠাসহ নানান জাতের পিঠার জন্য খোলা, দধির পাতিল, টালি, ব্যাংক, বড্ডুয়া, ঘট, মুটকি,থালা, বাসনসহ বিভিন্ন মাটির সরঞ্জাম তৈরি করতো গ্রাম বাংলার কুমাররা। সেগুলো ভ্যান বা মাথায় করে বিক্রি করেই চলতো তাদের সংসার। খড়, কাঠি আর মাটির সাথেই তাদের জীবনপণ যুদ্ধ ছিলো।
তাদের এই বাহারি মাটির তৈরি সরঞ্জাম তৈরি দেখতে বিড় জমতো শত শত কৌতুহলী দর্শকের। আর চুলোয় আগুন দেবার সময় আয়োজন করতো কুমাররা, মিষ্টি কিংবা ছিড়ার মোড়া বিলি করতো তারা। সময়ের পেক্ষাপটে হারিয়ে গেছে এসব চিত্র। এখন অর্থাভাব নানা সমস্যার কারনে তারা কুমার পেশা ছেড়ে দিয়ে ভিন্ন পেশায় ধাবিত হচ্ছে। এর ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজারো বছরের ঐতিহ্য আর গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার আইটপাড়া, পাইকপাড়া গনিয়াসহ এখন মাত্র ১শ থেকে ১শ ২০টি পরিবার মৃৎ শিল্পের সাথে জড়িত। সরেজমিনে উপজেলার ৪নং সুবিদপর ইউনিয়নের আইটপাড়া গ্রামে ও ৭নং পাইকপাড়া ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামে কয়েকজন কুমারের সাথে কথা হয়।
বাবুল পাল নামে এক কুমার ও তার স্ত্রী তাদের দুর্বিসহ জীবনের কথা বলেন। এখন আর এ পেশায় ঠিকমতো সংসার চলে না তাদের। খেয়ে না খেয়েই কাটে তাদের দিন। এ পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় যাবার পুঁজিও নেই বলে পেশা পরিবর্তন করতে পারছেন না তারা।
নেকপাল নামে এক কুমার জানান, এক সময় মাটি পেতাম বিনামূল্যে, আর গত দু’বছর আগেও তা ছিলো মাত্র চারশ’ টাকা প্রতি গাড়ি। আর এখন তা দেড় থেকে দু’হাজার’ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কাঁচামালগুলো পোড়াতে কাঠ আর খড়ের দাম বেড়েছে কয়েকগুন। সব মিলিয়ে বাজারের সব কিছুর দাম বাড়লেও দাম বাড়েনি মাটির তৈরি সরঞ্জামের । একটি খোলা তৈরিতে প্রায় দশ টাকা খরচ হলেও বিক্রি হয় বারো টাকা।

 


এ সময় মিঠু পাল জানান একই কথা। সরঞ্জামাদি তৈরিতে খরচের সাথে বাজার মূল্য নেই। এছাড়াও আগের মতো এখন আর মাটির পাত্রের চাহিদাও নেই। কারো প্রয়োজন হলে মাঝে মধ্যে নেন। বছরের অধিকাংশ সময়ই কাটে বসে থেকে। এ পেশায় থাকার কারণে আর কোনো কাজ করতে পারেন না তারা। এজন্য সংসার চালাতে কষ্ট হয়।
অপর এক কুমার স্বপন চন্দ্র জানান, তাদের পরিবারের সবাই ছিল কুমার পেশার সাথে, এখন আর নেই। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে পড়াশোনা করে চাকরি আর নানা পেশায় বিচরণ তাদের। এরকম কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা জানান, লেখাপড়া করে তারা কয়েকজন চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও অধিকাংরাই কষ্ট করে বাপ-দাদার এ পেশা চালিয়ে যেতে বাধ্য।
তারা আরও জানান, সরকারি সহযোগিতা বা প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শত বছরের ঐতিহ্য এ পেশাটি টিকে থাকতে পারবে। নতুবা কালের আবর্তনে হারিয়ে যাবে মৃৎ শিল্প। এ শিল্পকে ধরে রাখতে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি জনসাধারণকে মাটির পাত্রের ব্যাবহারের পরামর্শ জানান।

৪নং সুবিদপুর পরিষদ চেয়ারম্যান (ইউপি) মহসিন তপদার জানান, মাটির জিনিসের চাহিদা কমতে থাকায় এবং দূরের এলাকা থেকে বেশি দামে মাটি কিনতে হয় বলে মৃৎশিল্পীরা দিন দিন এ ঐতিহ্য থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে কিছু সংখ্যক পরিবার বংশ পরম্পরার কারণে এ শিল্প ধরে রেখেছে। এ শিল্পের জন্য সরকারিভাবে যদি কোনো সহযোগিতা করা হয় তবে বাঙালির ঐতিহ্যময় এ শিল্প ধরে রাখতে পারবে মৃৎশিল্পীরা।


এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ

ফেসবুকে মানব খবর…