করোনার ঈদেও চিরাচরিত রীতিতে করা যাবে না কোলাকুলি। স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রেখে মানতে হবে সামাজিক দূরত্ব। ফাইল ছবি
মানবখবর ডেস্ক:
লকডাউনের বিধিনিষেধের ঘেরাটোপে বন্দি থেকে করোনাময় দিনে গত বছরের মতো এবারও এলো আনন্দের ঈদ। গত বছরের মতো সতর্কতার মাঝে থেকেই কুড়িয়ে নিতে হবে যার যার ঈদের আনন্দ। আজ শুক্রবার সকাল থেকেই সারা দেশে পালিত হবে ঈদুল ফিতর।

বৃহস্পতিবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় শাওয়াল মাসের চাঁদ উঠার পর টেলিভিশন, রেডিওতে সম্প্রচার করা হচ্ছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ’। এর মধ্য দিয়ে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর এসেছে খুশির বার্তা নিয়ে। সবার মনে ঈদের খুশি ও আনন্দ দোলা লাগছে। পাশাপাশি চলছে পরস্পরর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও ফোনে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। তবে করোনার দিনে মানুষকে সতর্ক হয়েই চলতে হবে।

করোনার সবচেয়ে কার্যকর রক্ষাবব্যূহ মাস্ক। সেটা পড়েই চলতে হবে পথে-ঘাটে। একে-অপরকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরা নয়, সামাজিক দূরত্ব মেনে নিরাপদ দূরত্ব থেকে চলবে একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়। করমর্দন হলে ভুলে যাওয়া কোনোভাবেই ঠিক হবে না হাত স্যানিটাইজ করে নেওয়ার কথা। গা ঘেঁষে পাশাপাশি বসে ঈদের আড্ডা দেওয়াও কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। এতোসব বাঁধার মধ্যেই আত্মরক্ষা মেনে ধর্মভক্ত মানুষ ঈদের পরম আনন্দ লুটে নিতে থাকবে। আর স্বপ্ন দেখবে বেঁচে থাকলে সামনের ঈদটি যেনো করোনা মুক্ত আলোকোজ্জ্বল দিনে পালনের সুযোগ পাওয়া যায়। অদৃশ্য করোনার থাবা ভয়ংকর,প্রাণঘাতী । এখনও এর প্রতিকারে, প্রতিরোধে শতভাগ কার্যকর ওষুধ কিংবা টিকার সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাই সতর্কতাই একমাত্র অবলম্বন। সামাজিক দূরত্ব ও মাস্কই এখনও সবচেয়ে সেরা রক্ষা কৌশল। এ কথা ভুলে যাওয়া মানেই ঝুঁকি, বিপদের হাতছানি। এরই মধ্যে ভারতের ডাবল ও ট্রিপল মিউটেন্ট দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশংকাও মানুষকে উদ্বেগে রেখেছে। তো সতর্ক থেকে, দূরত্ব রেখে, বিধি-নিষেধ মেনে ঈদের আনন্দ যতোটা উপভোগ করা যায় ততটা পেয়েই তুষ্ট থাকতে হবে সবাইকে। এরই মধ্যে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাষ্ট্রপ্রতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন। তারা বলেছেন, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে না যেতে এবং নিজের ঘরে আব্ধে থেকেই ঈদ উপভোগ করার চেষ্টা করতে।

মুসলমানদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের দিন শুরু হবে সকালে ঈদের নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও এবার ৩০ দিন রোজা পালন শেষে বৃহস্পতিবার (১৩ মে) পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হয়েছে।

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আলাদা আলাদা বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা মহামারী উদ্ভুত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদ উদযাপন করতে দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সবাইকে ঘরে বসেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার আহ্বান জানানো হয়। ঈদ উপলক্ষে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকেও পৃথক বাণী দিয়ে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানানো হয়। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো হয়।

এদিকে, ঈদ উদযাপনের চিরায়ত যে ধারা দেড় হাজার বছর ধরে প্রচলিত, তা এ বছরে পুরোপুরি বিপরীত। বিশ্ব মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের মতো এবারো ঈদ উদযাপন হবে সীমিত। ঈদের জামাত হবে মসজিদে। সরকারের পক্ষ থেকে জোর দিয়েই বলা হয়েছে, মহামারিকালের এই ঈদে পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলানো ও কোলাকুলি থেকে বিরত থাকতে হবে। যথাসম্ভব বাইরে না গিয়ে ঘরে থেকে পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কাটাতে হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশে সব ধর্ম এবং বর্ণের মানুষ বারাবরে এ উৎসবে সমানভাবে শামিল হন। ঈদের আনন্দ সবাই ভাগাভাগি করে উপভোগ করেন। কিন্তু, ঘরবন্দি জীবনে এবার না যাওয়া যাবে প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে, না হবে তাদের আমন্ত্রণ করা।

করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের মতো এবারো জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রত্যেক মসজিদেই একাধিক ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বেশ কিছু শর্ত দিয়ে গত ২৬ এপ্রিল ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, এসব নির্দেশনা না মানলে ‘আইনগত ব্যবস্থা’ নেয়া হবে।

শর্তগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পরিবর্তে ঈদের নামাজের জামাত নিকটস্থ মসজিদে আদায় করতে হবে। প্রয়োজনে একই মসজিদে একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হবে। জামাত শেষে কোলাকুলি এবং পরস্পর হাত মেলানো যাবে না। ঈদের নামাজের জামাতের সময় মসজিদে কার্পেট বিছানো যাবে না। নামাজের পূর্বে সম্পূর্ণ মসজিদ জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মুসল্লিরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে জায়নামাজ নিয়ে আসবেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ নিশ্চিতকল্পে মসজিদে অজুর স্থানে সাবান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। মসজিদের প্রবেশ পথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ সাবান ও পানি রাখতে হবে। প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসা থেকে অজু করে মসজিদে আসতে হবে এবং অজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। ঈদের নামাজের জামাতে আগত মুসল্লিকে অবশ্যই মাস্ক পরে মসজিদে আসতে হবে। মসজিদে সংরক্ষিত জায়নামাজ ও টুপি ব্যবহার করা যাবে না। ঈদের নামাজ আদায়ের সময় কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দাঁড়াতে হবে। এক কাতার অন্তর অন্তর কাতার করতে হবে। শিশু, বয়োবৃদ্ধ, যে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি এবং অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি ঈদের নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। সর্বসাধারণের সুরক্ষা নিশ্চিত কল্পে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর নির্দেশনা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। করোনাভাইরাস মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে দোয়া করার জন্য খতিব ও ইমামদের অনুরোধ করা যাচ্ছে। খতিব, ইমাম ও মসজিদ পরিচালনা কমিটি বিষয়গুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।

এদিকে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল সাতটায়, দ্বিতীয় জামাত সকাল আটটায়, তৃতীয় জামাত সকাল ৯টায়, সকাল ১০টায় চতুর্থ জামাত এবং পঞ্চম ও সর্বশেষ জামাত সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদে একাধিক জামাতের ব্যাবস্থা রাখা হয়েছে।

Share This post