মানব খবর : হাজীগঞ্জের বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয়ে বেতন ও পরীক্ষার ফি জমা দিতে ব্যাংকের ভিতরে (উপরে) ও ব্যাংকের প্রবেশ পথে (নিচে) শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভীড়। পাশে দুই শিক্ষার্থীর কাছে ১ হাজার ও ৪৭০ টাকা আদায়ের রিসিট।

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্ :
করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ঠেকাতে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করছে সরকার। কিন্তু করোনাকালে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এবং বাড়িতে মূল্যায়ন পরীক্ষা নেয়ার অজুহাতে শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে যাবতীয় পাওনা (বকেয়া সেশন ফি, বেতন ও পরীক্ষা ফি) আদায়ের করছে বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয়।
পরীক্ষা উপলক্ষে গত সপ্তাহে করোনা সংক্রমনের ঝুঁকি নিয়ে ও স্থানীয় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় ডেকে আনেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মজিবুর রহমানসহ অন্যান্য শিক্ষকরা। পরে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করে বকেয়া সেশন ফি, মাসিক বেতন ও পরীক্ষার ফি আদায় করে প্রশ্নপত্র এবং পরীক্ষার খাতা শিক্ষার্থীদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন বলে, অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর বেতন ১০০ টাকা, অষ্টম শ্রেণির ১২০ টাকা এবং নবম ও দশম শ্রেণির বেতন ১৫০ টাকা। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষার ফি ১৫০ টাকা এবং নবম ও দশম শ্রেণির পরীক্ষার ফি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি মাসের ৫ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মাঝে পরীক্ষার প্রশ্ন ও খাতা বিতরণ করা হবে। পরীক্ষার প্রশ্ন ও খাতা পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাড়িতে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করবে এবং আগামি ১৭, ১৮ ও ১৯ তারিখের মধ্যে বিদ্যালয়ে এসে পরীক্ষার খাতা জমা দিতে হবে।
এ দিকে পরীক্ষার প্রশ্ন ও খাতা গ্রহণের প্রথম দিনে (সোমবার) বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয় এবং বেতন ও পরীক্ষার ফি ব্যাংকে জমা দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে অসংখ্য শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এ সময় শিক্ষার্থীদের সামাজিক দুরত্ম কিংবা মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ কোন ধরনের সচেতনতামূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এতে করোনা সংক্রমনের ঝুঁকির আশংকা করছেন সচেতন অভিভাবকমহল। তারা বিদ্যালয়ের এমন কার্যক্রমের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
কয়েকজন অভিভাবক বলেন, করোনাকালে অনেক অভিভাবক কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার ছিলেন। বিশেষ করে নিন্মবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির লোকজনকে সবচে বেশি আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছে। অথচ এই আর্থিক সংকটের মুহূর্ত্বে ছেলে-মেয়েদের স্কুলের বেতন ও পরীক্ষা ফি আদায়ের জন্য চাপসৃষ্টি করছেন শিক্ষকরা। এতে করে অনেক অভিভাবক অসহায় হয়ে পড়েছেন। অপর দিকে ছেলে-মেয়েদের বিদ্যালয়ে ডেকে নিয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছেন শিক্ষকরা।
অমল কান্তি ধর নামে অভিভাবক জানান, আমার ছেলেকে ১৪৫০ টাকা পরিশোধ করার জন্য বিদ্যালয় থেকে বলা হয়েছে। আমি ১ হাজার টাকা দিয়েছি। মো. শরিফ হোসেন আরেকজন অভিভাবক জানান, আমার ছেলেকে ১৩৭০ টাকা পরিশোধ করার জন্য বিদ্যালয় থেকে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান বলেন, বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনলাইনে ক্লাস নেয়া হয়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মূল্যায়ন পরীক্ষা নেয়া হবে। সরকারি নির্দেশনা নেই স্বীকার করে তিনি বলেন, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে বাড়িতে পরীক্ষা নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন আদায়ে বাধ্য করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে মো. মজিবুর রহমান বলেন, এটি মিথ্যা কথা। বেতন ও পরীক্ষার ফি আদায়ে কাউকে বাধ্য করা হচ্ছেনা। যে যা পারছেন (মাসিম বেতন), তা পরিশোধ করছেন। কেউ বেতন না দিলেও পরীক্ষা ফি দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে বলে তিনি জানান।
বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সদস্য রবিউল আলম অরুন জানান, সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমি কিছু জানিনা। তবে বিষয়টি জানার পর, অভিভাবকদের বলেছি যে যা পারেন, তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করান। ম্যানেজিং কমিটির অপর এক সদস্য হোসাইন লিটন বলেন, পরীক্ষার ফি দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা অংশ নেয়ার জন্য আমি অভিভাবকদের বলেছি।
এ ব্যাপারে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান মিন্টুর সাথে কথা হলে তিনি জানান, পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকেও কোন বিদ্যালয়কে এ ব্যাপারে কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। আর মাসিক বেতন নেয়ার তো প্রশ্নই আসে না।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের ঢেকে আনা এবং তাদের কাছ থেকে বেতন ও পরীক্ষা ফি আদায় বন্ধ করার বিষয়ে বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিতকরণসহ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বৈশাখী বড়ুয়া বলেন, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, এ বিষয়ে আজ (সোমবার) উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করে, তাদের কার্যক্রম বন্ধ করা নির্দেশনা দিয়েছেন। তাছাড়া আমি বিদ্যালয়ের সভাপতির সাথে কথা বলেছি, তিনি বিষয়টি জেনে আমাকে অবহিত করবেন।

Share This post