গাজী সালাহউদ্দিনঃ-
একটি উপজেলায়  শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুসারে যে পরিমাণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকার প্রয়োজন ছিল বাস্তবে কিন্তু তা নেই। প্রতিটি এলাকায় উচ্চ বিদ্যালয়ের  পাশাপাশি প্রাথমিক লেভেলে এ সংকট ছিল তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। অভিভাবকদের আগ্রহ ও শিক্ষার্থীদের চাহিদার কথা ভেবে দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায়  শিক্ষানুরাগী বেশ কিছু উদ্যোক্তারা বিভিন্ন নামে কিন্ডারগার্টেন স্কুল গড়ে তোলেন। এগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থাও আছে । দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কারণ এই প্রতিষ্ঠান গুলো গড়ে ওঠার কারণে একদিকে বেশকিছু শিক্ষিত মানুষের বেকারত্বের অবসান হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। ভালো ফলাফল অর্জনও করছে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো। বেসরকারিভাবে গড়ে তোলা এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফলও ঈর্ষণীয়। যে কারণে সচেতন অভিভাবকদের বেশিরভাগই তাদের ছেলেমেয়েদের এসব প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ভালো ফলাফল অর্জনের পেছনে বেশ কিছু কারণও রয়েছে। এ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান গুলোতে শিক্ষার্থী নেওয়া হয় কোটা সিস্টেমে। শিক্ষার্থী বেশি হলে ৩০ অথবা ৪০ জন করে প্রতিটি ক্লাসে শাখা করে নেয়া হয়। কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে  একই প্রিয়ডে একের অধিক অর্থাৎ ২-৩ জন শিক্ষক ক্লাস নিয়ে থাকেন। এ সকল কারণে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো অভিভাবকদের আস্থা পুরনে সক্ষম হয়েছে।

বিনা পয়সায় পড়ানোর সুযোগ থাকার পরও কখন অভিবাবকরা টাকা পয়সা খরচ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্তানদের ভর্তি করান, পড়ালেখা করতে দেন যখন সেখানে সর্বোত্তমটাই  পান এবং তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফলটাও পান। এভাবে দেশের শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশের দায়িত্ব প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে বড় ধরনের সহযোগিতা করে আসছে।
একটি দেশে শিক্ষিত বেকারত্ব দূর করার কথা যদি বলি তাও সরকারের দায় বদ্ধতার মধ্যে পড়ে। শিক্ষা মৌলিক অধিকারের একটি। প্রত্যেক নাগরিকের এ অধিকার পূরণেও সরকার সাংবিধানিক ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। গুরুত্বপূর্ণ এই দু’টি  কাজ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো  সরকারকে পরোক্ষভাবে সহায়তা দিয়ে  যাচ্ছেন নিয়মিত । অথচ করোনা কালে এ বেসরকারী  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারের উদাসীনতা দেখে বিস্মিত হতে হলো! এই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের প্রতি সরকার ও সংশ্লিষ্টদের সামান্যতম দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। এ করোনা কালে বোঝা গেছে এরা শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পরও এ শ্রেণিটার প্রতি সামান্যতম ভাবার প্রয়োজন মনে করেনি সংশ্লিষ্টরা। যারা শিক্ষা বিস্তারে এতদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে, বৈশ্বিক এই মহামারীতে তারা অন্তত প্রতিবাদ, দাবি দাওয়ার কথা বলেও আত্ম মর্যাদা বিসর্জন দিতে যাননি। এ সময় নিজেদের দৈন্যতার কথা কাউকে প্রকাশ করারও চেষ্টা করেনি। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা যদি বলি, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চেয়ে প্রাথমিক লেভেলে কেজি স্কুলের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গড়ে তোলা না হতো তাহলে এখানে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের  জন্য সরকারের আরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার প্রয়োজন হতো। আরো শিক্ষক নিয়োগ করার প্রয়োজন হতো। এতে সরকারের প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হতো। এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। তাই সাময়িক সময়ের জন্য হলেও প্রাথমিক লেভেলের বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি দায়িত্ববোধ প্রদর্শনের প্রয়োজন ছিল সংশ্লিষ্টদের।
যতোদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ ছিল, ততোদিন সরকারের পক্ষ থেকে সামর্থের মধ্যে বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা অপরিহার্য ছিল। যারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে আছেন তারা সরকারি বেতনের পাশাপাশি কেউ কেউ আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য প্রাইভেট পড়ান না তা-ও নয়। এমপিও শিক্ষকরাও সরকার থেকে প্রাপ্ত বেতনের পাশাপাশি আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য প্রাইভেট পড়ান। সরকারি বেতন ভুক্ত এ সকল শিক্ষকরা যেহেতু বেতন-ভাতা পান সেহেতু প্রাইভেট না পড়ালেও তা দিয়ে তারা স্বাচ্ছন্দে চলতে পারবেন। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত শিক্ষকরা যা পান সেটাকে বেতন বললে ভুল হবে। বরং তারা নাম মাত্র একটা সম্মানি পান। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়  ব্যয় প্রচুর। যে কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের হ্যান্ডসাম স্যালারি দেওয়া সম্ভব হয় না। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেশিরভাগ গড়ে ওঠে ভাড়া বাড়িতে অথবা ভাড়া জায়গায়। যেখানে মোটা অংকের ভাড়া গুনতে হয় ।প্রতিটি ক্লাসে দুইটা সেকশন থাকলে ২-৩ জন করে প্রতি ক্লাসে ৪-৬ জন শিক্ষকের প্রয়োজন হয়। প্রতি ক্লাসে তিনটি সেকশন হলে ২-৩ জন করে প্রতি ক্লাসে ৬-৯  শিক্ষকের  দরকার হয়।  এতে প্রতিটি বেসরকারি বিদ্যালয় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত চালালেও প্রায়  ৩৫ থেকে ৪০ জন শিক্ষক থাকেন। এ সকল শিক্ষককে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা করে সম্মানী দিতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন পড়ে। এদিকে যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন, তাদের বিদ্যালয়ের কারণে সম্মানিত হওয়ার পাশাপাশি কিছু লাভ করার অভিপ্রায়ও থাকে। সব মিলে এ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষকদের আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার বেশি সম্মানী দেওয়া সম্ভবও হয় না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জীবিকা নির্ভর করে অনেকটা প্রাইভেট পড়ানোর উপরই। বৈশ্বিক মহামারী  করোনায় যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন থেকেই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে পড়া দেওয়া ও অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অব্যাহত রেখেছেন।
সরকার দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা চিন্তা করে এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে লকডাউন তুলে নিয়েছেন। এতে করে দেশের বেশিরভাগ মানুষ তাদের কাজ- কর্মে  ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা কর্মরত ছিল তাদের আর্থিক দৈন্যতা চরম আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যে সম্মানীটুকু পেতেন, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। করোনা মহামারীর শুরুতে অসহায়দের খাদ্য সামগ্রী বিতরণ, ভাতা প্রদান ও কোন কোন ক্ষেত্রে কাউকে কাউকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হলেও শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসা শ্রেণিটাকে পাশ কাটিয়ে গেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রেক্ষাপট চিন্তা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগ পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা সরকারের পক্ষে কর্তব্য হয়ে পড়েছে। তাই এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। প্রত্যেক উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বেসরকারি এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের তালিকা প্রণয়ন করে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে
সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

লেখকঃ সাংবাদিক,শিক্ষক ও চারুশিল্পী

Share This post