মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
চাঁদপুরে করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে নিহত ২০৭ জনের লাশ দাফন করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আলেম-ওলামাদের সমন্বয়ে গঠিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর চাঁদপুর জেলার স্বেচ্ছাসেবক টিম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চাঁদপুরের ৮টি উপজেলায় গঠিত স্বেচ্ছাসেবক টিমের সদস্যরা এই কাজ সম্পন্ন করে। তাদের দেখাদেখি করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গে নিহতদের দাফন ও সেবায় এগিয়ে আসেন বেশ কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি।
দেখা গেছে, গত বছরের (২০২০ইং) মার্চ মাসে দেশে করোনায় আক্রান্ত (কোভিড-১৯) রোগী চিহিৃত হওয়ার পর এবং এই রোগে আক্রান্ত ও উপসর্গে নিহত ব্যক্তিদের দাফন কিংবা সৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি। বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জানা গেছে, বহু সময় ধরে হাসপাতালের মর্গে কিংবা ঘর-বাড়িতে লাশ পড়ে আছে। পরিবারের লোকজন, নিকট আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী কেউই আসেনি।
এমন অমানবিক সংবাদ ও পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলার বাহিনীর সদস্যরা (পুলিশ)। এরপর ওই বছরের এপ্রিল মাসে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও উপসর্গে নিহত ব্যক্তির মৃতদেহ দাফনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র আমির ও পীর সাহেব চরমোনাইয়ের নির্দেশে সারাদেশের মতো চাঁদপুর সদর, হাজীগঞ্জ, শাহারাস্তি, কচুয়া, ফরিদগঞ্জ, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ ও হাইমচর উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠণ করে।
এরপর থেকেই দিনে বা রাতে যেকোনো সময়ে ডাক পড়লেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর স্বেচ্ছাসেবক টিম হাজির হয়ে যান হাসপাতাল বা মৃতের বাসা-বাড়িতে। যথাযথ ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী মমতা নিয়ে মৃত ব্যক্তির আপনজন হয়ে গোসল, কাফন এবং জানাযার মাধ্যমে শেষ বিদায় জানান তারা। একটি দাফন বা সৎকার শেষে নিরাপত্তার স্বার্থে কর্মীদের পরিধেয় পোশাকসহ অন্যান্য সরঞ্জাম তাৎক্ষণিক পুড়িয়ে ফেলা হয়।
এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর হাজীগঞ্জ উপজেলা শাখার সেক্রেটারী এবং করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গে নিহত ব্যক্তির দাফনের লক্ষ্যে তৃতীয় ধাপে গঠিত স্বেচ্ছাসেবক টিমের প্রধান হাফেজ মো. শাহাদাত হোসেন প্রধানীয়া বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এবং পীর সাহেব চরমোনাইর নির্দেশনাক্রমে ও সংগঠনের চাঁদপুর জেলা শাখার নেতৃবৃন্দের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আমরা দাফন কাজ করে যাচ্ছি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর চাঁদপুর জেলার সভাপতি ও করোনায় মৃতদের দাফনে স্বেচ্ছাসেবক টিমের জেলা টিম প্রধান শেখ মুহা, জয়নাল আবদীন জানান, করোনা দেশের মানুষ যখন দিশেহারা, ঠিক তখন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিয়মতান্ত্রিক সকল কার্যক্রম স্থগিত করে মানুষের সেবায় এগিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, গত বছর দলের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে করোনায় মৃতদের মরদেহ দাফনে দল এবং সহযোগী সংগঠনের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। তারই আলোকে দাফন কমিটি গঠনের মাধ্যমে গণ-মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছে দলের নেতা-কর্মীরা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর চাঁদপুর জেলার সেক্রেটারী ও করোনায় মৃতদের দাফনে স্বেচ্ছাসেবক টিমের জেলা সমন্বয়কারী কে.এম ইয়াসিন রাশেদসানী জানান, শুধুমাত্র দাফন কার্যক্রম নয়, তার পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন উপকরণ ও করোনাকালীন সময়ে কর্মহীন অসহায়দের সাহায্যে বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। যা এখনো চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, এ ছাড়াও সম্প্রতি সময়ে আশংকাজনক হারে করোনা রোগী বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেন সংকট দেখা দিয়েছে। তাই কোভিড-১৯ রোগীর পাশে দাঁড়ানোর লক্ষে দলের পক্ষ থেকে অক্সিজেন সেবা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। আশা করি সবার সার্বিক সহযোগিতা পেলে আমাদের কার্যক্রম আরো বেগবান হবে।
এ দিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর স্বেচ্ছাসেবক টিম সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার (১ আগষ্ট) হাজীগঞ্জ পৌরসভাধীন ১০নং ওয়ার্ড রান্ধুনীমূড়া (মনিনাগ) গ্রামে আবুল খায়ের মজুমদার (৭৮) লাশ দাফনের মধ্য দিয়ে ২০৭ জন মৃতের শেষ বিদায় জানায়। তিনি শনিবার রাতে করোনা আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর সিকদার মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
একই দিনে (১ আগষ্ট) উপজেলার কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নের নওহাটা গ্রামের আনোয়ার হোসেন বাচ্চু মিয়া (৬৫) করোনা উপসর্গে নিয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাকেও (২০৬ তম ব্যক্তি) শেষ বিদায় জানান দলের স্বেচ্ছাসেবকরা। এই দুই জনের দাফন টিমের নেতৃত্বে ছিলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র হাজীগঞ্জ উপজেলা শাখার সেক্রেটারী হাফেজ মো. শাহাদাত হোসেন প্রধানীয়াসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
একই দিনে (১ আগষ্ট) শাহরাস্তি উপজেলার সূচীপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের বাসিন্দা রিয়াজ আহমাদ তালুকদারের (৬০) দাফন সম্পন্ন করেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শাহরাস্তি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও স্বেচ্ছাসেবক টিমের প্রধান হাফেজ নূর মোহাম্মদ। দাফনকৃত ব্যক্তি (২০৫ তম) করোনা আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।
 এর আগে শনিবার (৩১ জুলাই) ২০৪ তম ব্যক্তি মো. আজিজ উল্ল্যাহ্ মিয়াজী (৭২) দাফন সম্পন্ন করেন, দ্বীনি সংগঠন বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটির ফরিদগঞ্জ উপজেলার ছদর মাওলানা হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ফরিদগঞ্জ উপজেলার সে¦চ্ছাসেবকদলের সদস্যরা। তিনি ফরিদগঞ্জ ডায়াবেটিক হাসপাতালে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান।
একই দিনে (৩১ জুলাই) চাঁদপুর সদর হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান, শাহরাস্তি উপজেলার সূচীপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের বাসিন্দা হালিমা খাতুন (৯০)। তার মৃত দাফন (২০৩ তম ব্যক্তি) করেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর শাহরাস্তি উপজেলা শাখার স্বেচ্ছাসেবক টিমের সদস্যরা।
একই দিনে (৩১ জুলাই) মতলব দক্ষিণ উপজেলাধীন মতলব পৌরসভার বাসিন্দা আমেনা বেগম (৪৫) করোনা আক্রান্ত হয়ে (২০২ তম ব্যক্তি) নিজ বাড়িতে মারা যান। এ দিন মতলব উত্তর উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা রহিমা বেগম (৫৫) করোনায় আক্রান্ত হয়ে (২০১ তম ব্যক্তি) চাঁদপুর সদর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের দুই জনের দাফন টিমের নেতৃত্বে ছিলেন, সংগঠনের চাঁদপুর জেলার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাও. আনোয়ার আল-নোমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

এর আগে একই দিনে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গে নিহত ২’শ তম ব্যক্তির দাফন সম্পন্ন করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র হাজীগঞ্জ উপজেলা শাখার স্বেচ্ছাসেবক টিম। এদিন উপজেলার বড়কূল পূর্ব ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ (৭০) নামের একজনের দাফন করে তারা। তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে  মৃত্যুবরণ করেন। দাফন টিমের নেতৃত্বে ছিলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র হাজীগঞ্জ উপজেলা শাখার সেক্রেটারী হাফেজ মো. শাহাদাত হোসেন প্রধানীয়াসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

Share This post